সত্যীকারের বন্য মানুষ!!!

ছোট্ট বন্ধুরা টারজান, মোগলিদের তোমরা নিশ্চই চেনো। এদের কাহিনীও তোমাদের অনেকের জানা। জঙ্গলে বেড়ে ওঠা টারজান, মোগলি কি শুধু গল্পের বা টিভি সিরিয়ালের? না, বাস্তবেও এদের অস্তিত্ব আছে বা ছিলো। তোমাদের দেখা বন্য ভয়ঙ্কর সব প্রাণীদের সাধে এদের বন্ধুত্ব বা এদের দ্বারা দুষ্ট লোকের দমন তোমাদের অনেক ভালো লাগলেও টারজান বা মোগলি যখন তাদের বাবা,মা, আত্মীয় ছাড়া একবারে ছোট্ট বয়সে জঙ্গলে থেকেছে তখন তাদের জীবনজিবীকা কেমন ছিলো ধারণা করতে পারো? তাহলে চলো জঙ্গলে বেড়ে ওঠা রহস্যময় বন্য মানব শিশুদের সম্পর্কে কিছু বাস্তব ঘটনা জেনে নেই।
http://www.bd-pratidin.com/assets/images/news_images/2014/08/31/01_27307.jpg
রহস্যময় বন্য মানব শিশু
প্রাচীন কাল হতে শুরু করে আজ আধুনিক যুগ পর্যন্ত সব সময়েই মানব ইতিহাসে বন্য মানব  শিশুর কথা শোনা গেছে বারবার। বন্য মানব শিশু বলতে যারা জঙ্গলে বেড়ে উঠেছে বা জঙ্গলে থাকে তাদের বোঝায়। এর সাধারণত চার হাতপায়ে চল ফেরা করে, বড়বড় চুলওয়ালা, জন্তু জানোয়ারের মত আচরণ প্রকাশ করে। এ ধরণের শিশু যারা প্রাণীদের দ্বারা লালিত পালিত হয়।  এরা নয় মানুষ নয় জানোয়ার। হয়তো ছোট কালে কোনভাবে হারিয়ে গিয়েছিলো অথবা বাবা মা দ্বারা পরিত্যক্ত হয়েছিলো বা চুরি হয়ে গিয়েছিলো। সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা হয় নিজে নিজে বা বন্য প্রানীদের দ্বারা লালিত পালিত হয়েছিলো। মানুষের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তারা ঠিকমত কথা বলতে পারেনা, হাটতে পারে না। এবং শেষ পর্যন্ত বন্য পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বন্য মানব শিশুটি ছেলে হোক বা মেয়ে, তারা বানর নেকড়ে বা অস্ট্রিস যার সংস্পর্শেই থাকুক না কেন তাদের সকলের মাঝেই একটি সাধারণ ব্যাপার দেখা যায়। তাদের কাছে তাদের অন্ধকার অতীত একটি রহস্য হয়েই সারা জীবন থেকে যায়।
এরকম একটি বন্য শিশু হল অ্যভেরণের ভিক্টর। ট্রফটের একটি বিখ্যাত ছবি ‘‘এল ইনফ্যান্ট সেভ্যাজ’’ এর কল্যাণে এ নামটি অমরত্ব লাভ করেছে। অনেকের কাছেই বন্য শিশুর এ কাহিনীটি আনকোরা নতুন ছিলো। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ভিক্টর সর্বসাধারণের মাঝে প্রকাশ পায়। সে দক্ষিণ ফ্রান্সের ল্যাকাউন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে একা একা বিচরণের সময় প্রায়ই গ্রামবাসীদের সম্মুখীন হয়ে পড়ত। গ্রামের চাষীরা একবার ওকে ধরে ভিলেজ স্কয়ারে নিয়ে গিয়েছিলো।
১৭৯৯ বা ১৮০০ সালের শীতের মাঝামাঝি পর্যায়ে (তার প্রথমবার ধরা পড়ার প্রায় দুই বছর পরে) তার বনে ঘুরে বেড়ানো বন্ধ হযে গেল। এবার সে ধরা পড়ে ছিল ‘ভিদাল’ নামে এক লোকের কাছে। এরপর সে আর কোনোদিন বনে ফিরে যায়নি।
ভিক্টরকে যখন প্রথম দেখা গেল তখন তার বয়স ছিল প্রায় ১২ বছর। তার  আগের সময়টাতে সে নিজে নিজে লালিত হয়েছে। ভিক্টরের বুঝতে পারার সমস্যা ছিল। তাই তাকে তার বাবা তাকে প্রায় ৬ বছর বয়সে সেই জঙ্গলে ফেলে রেখে চলে যায়। সম্ভবত সেই সময়টাতে ফিলোসোফিকাল ডিবেটের একটি গরম টপিক ছিল রোউসির থিয়োরী। এ থিয়োরী অনুসারে প্রকৃতিতে লালিত কোনো শিশুকে যদি সমাজের সংস্পর্শে আনা হয় তবে সে শান্ত ও অমলিন হয়ে যাবে কিন্তু যখন ভিক্টরের উপর এই ব্যাপারটি নিয়ে পরীক্ষা চালানো হলো তখন এই থিরোরী ভুল প্রমাণিত হলো। ভিক্টরকে পরীক্ষা করা হয়েছিল আলোক উৎস অনুসরণ করানোর মাধ্যমে। ফলাফলে দেখা গেল সে উৎস অনুসরণ না করে বরং সেখান থেকে সরে গেল। এছাড়াও আরও অনেক পরীক্ষার ফলাফলে তাকে বিশুদ্ধ আত্মার চাইতে বরং বন্য জানোয়ারই বেশি মনে হচ্ছিল।
বন্য শিশুদের মাঝে যে বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায় ভিক্টরের মাঝেও ঠিক তাই দেখা গিয়েছিল। তার গলায় ঝোলানো পাওয়া গিয়েছিল ছিড়ে ন্যাকড়ায় পরিণত হওয়া শার্ট। তারও পোষাক পরার প্রতি ভীষণরকম অনীহা ছিল। এ ব্যাপারে তাকে জোর করা হলে সে কাপড় ছিড়ে ফেলত। কোনো রকম অসুস্থতা ছাড়াই সে অতি উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারত। প্রাণীদের মতো সেও ছিনিয়ে খাবার নিত এবং গোগ্রাসে গিলত। তার চরিত্রের আরও কিছু লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছিল যা আমরা বর্তমানে স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার বলে জানি। যেমনÑআশেপাশের লোক সম্পর্কে আগ্রহের কমতি থাকা, রুমের এক কোনায় গুটিসুটি মেরে ঘণ্টার পর ঘন্টা বসে থাকা।
অতঃপর ডক্টর জিন ইটার্কের পাঁচ বছর পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে ভিক্টর কিছু কিছু কথা বলা, পড়া ও লেখা শিখতে পেরেছিল। কিন্তু তারপরও সে অনেক কিছুই কখনও শিখতে পারেনি। যেমন সে কখনো যোগাযোগের কোনো মাধ্যম ব্যবহার করতে পারত না। তাছাড়া সে জঙ্গলে কিভাবে একা এল, তার কাধে থাকা ভয়ানক দাগটা আসলে কিসের এটা সে কখনোই বলতে পারেনি।
ভিক্টর নিজে নিজে লালিত পালিত হয়েছিল। কিন্তু এমন অনেক বন্য শিশু আছে যারা বণ্যপ্রাণীর দ্বারা লালিত পালিত হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এটা একটা বিতর্কের ব্যাপার যে, একটা নেকড়ের দুধ খেয়ে কোনো মানুষের পক্ষে কি আদৌ বেঁচে থাকা সম্ভব?
এ ধরনের গল্পে থাকে পরিপূর্ণ মিথ এবং লিজেন্ড। এমনই একটি গল্প আছে অ্যাগিসথাস নামে একটি শিশুর। ‘ডে বেল্লো গোথিকো’ তে প্রোকপিয়াস লিখেছেন, অ্যাগিসথাসকে তার মা এক যুদ্ধের সময় জঙ্গলে ফেলে রেখে গিয়ে
রহস্যময় বন্য মানব শিশু
রহস্যময় বন্য মানব শিশু
ছিলো। সে প্রতিপালিত হয়েছিল ছাগলের দুধ খেয়ে। এরপর যুদ্ধ শেষে যারা বেঁচে ছিল তারা বাড়ি ফেরার সময় অ্যাগিসথাসকে খুঁজে পান।
খ্রিষ্টের জন্মের ২৫০ বছর পূর্বের আন্দ্রে তলস্তিকের গল্প ও শোনা যায়। তাকে তার বাবা মা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে, সে প্রতিপালিত হয়েছে তাদের পরিবারেরই একটি কুকুরের কাছে।
ইন্ডিয়ান নেকড়ে কন্যা কমলা এবং অমলা’র সেই মজাদার কাহিনী আজ প্রায় ৮০ বছর ধরে বিতর্কের চরমে অবস্থান করছে।  তাদেরকে একসাথে এক নেকড়ের  আস্তানায় পেয়েছিলেন সিং নামে এক বিশিষ্ট ভদ্রলোক। অমলা এরপর প্রায় এক বছর পরে মরে যায়। কিন্তু কমলা ১৯২৯ সাল পর্যন্ত (আনুমানিক ১৭ বছর বয়স ) বেঁচে ছিল। যখন তাদের প্রথম পাওয়া গিয়েছিল তখন তারা চার হাত পা ব্যবহার করে হামাগুড়ি দিয়ে চলত। কাপড় পরত না এবং নেকড়ের মতো করে খাবার খেত। কমলার সামনে কোনো মুরগীর বাচ্চা দেয়া হলে সে তা ঠিক নেকড়ের মতো করে খেত। যা হোক, সে শেষ পর্যন্ত মানুষের আচরণের অনেক কিছুই শিখেছিল। সে কিছু কথা বলাও শিখেছিল। তাদের পাওয়া গিয়েছিল ১৯২০ সালের দিকে। এ ঘটনাটা ধোঁকা না-কি সত্যি তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারে না।